জেনে নিন নাবালক শিশুর অভিভাবক কারা হবেন এবং কিভাবে নির্ধারণ করা হবে
নাবালক শিশুর অভিভাবক একটি গুরুত্ব বিষয়। আর নাবালক শিশুর সম্পত্তির ক্ষেত্রে তা আরো গুরুত্বপূর্ণ। নাবালক শিশুর অভিভাবক হিসেবে যেসব ব্যক্তির আইনগত স্বীকৃত রয়েছে তারা হলেন বাবা, বাবা কর্তৃক ইচ্ছাপত্র (উইল) দ্বারা নিয়োগকৃত ব্যক্তি, দাদা ও দাদা কর্তৃক ইচ্ছাপত্র (উইল) দ্বারা নিয়োগকৃত ব্যক্তি। এ ছাড়া আমরা জানি অভিভাবকত্ব বলতে নিজের দেখাশোনা করতে পারে না এমন ব্যক্তি অথবা তার সম্পত্তির এবং উভয়েরই তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা বা অধিকার। যেমন: নাবালক, উন্মাদ ও অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তিরা নিজেদের দেখাশোনা করতে অক্ষম। নাবালক বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝাবে, যার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি। নির্বোধ, উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ বলতে যে কোনো বয়সের ব্যক্তিকেই বোঝাবে। বিচ্ছেদপ্রাপ্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই নাবালক সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়ে থাকে। যা হোক, মুসলিম আইনে বাবাই সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক। আমরা এখন মুসলিম আইন অনুযায়ী অভিভাবকত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
মুসলিম আইন অনুযায়ী অভিভাবকত্ব ৩ প্রকার।
১. সন্তানের অভিভাবকত্ব,
২. সন্তানের সম্পত্তির অভিভাবকত্ব,
৩. সন্তানের অভিভাবকত্ব।
কারা সন্তানের অভিভাবক হতে পারেন :
মুসলিম আইনে বাবা হলেন সন্তানের স্বাভাবিক আইনগত অভিভাবক। মুসলিম আইনে মা সন্তানের অভিভাবক হতে পারেন না। তবে মা ৭ বছর বয়স পর্যন্ত পুত্র সন্তানকে ও বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত কন্যা সন্তানকে কাছে রাখতে পারেন। এ অধিকারকে বলে ‘হিজানা’ বা জিম্মাদারিত্ব। কিন্তু মা কখনই সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক হতে পারেন না। এখানে একটি ব্যাপার উল্লেখ্য যে, সন্তানরা অন্য নারী আত্মীয়ের যত্নে বড় হয়ে উঠলেও সন্তানের ওপর বাবার সার্বিক তত্ত্বাবধান থেকেই যায়। মা তালাক হওয়ার কারণে সন্তানের জিম্মাদারিত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন না। কিন্তু মা দ্বিতীয় বিবাহ করলে সন্তানের জিম্মাদারিত্বের অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। তবে সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ওই সন্তানের ওপর মায়ের অভিভাবকত্ব যথার্থ বিবেচিত হয় তা হলে আদালত মাকে ওই সন্তানের অভিভাবক নিয়োগ করতে পারেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিবাহ করলেই মা সন্তানের ওপর জিম্মাদারিত্ব হারান না। তবে স্বামী-স্ত্রী যখন বসবাস করেন, তখন সন্তান তাদের কাছেই থাকবে। একত্রে বসবাসের সময় স্বামী যেমন কোনোক্রমেই স্ত্রীর কাছ থেকে সন্তানকে সরিয়ে নিতে পারেন না, তেমনি স্ত্রীও নাবালক সন্তানের জিম্মাদারিত্বের অধিকার সত্ত্বেও স্বামীর অনুমতি ছাড়া সন্তানকে সরিয়ে নিতে পারেন না।
মা ছাড়া অন্য কারা নাবালকের জিম্মাদারিত্বের অধিকার লাভ করতে পারেন :
যখন কোনো নাবালকের মা মারা যান বা কোনো কারণে নাবালকের জিম্মাদারিত্বের অধিকার হারিয়ে ফেলেন সে ক্ষেত্রে নিচের মহিলা আত্মীয়রা জিম্মাদারের দায়িত্ব পাবেন। ১. মায়ের মা, যত ওপরের দিকে হোক (যেমন_ নানি, নানির মা প্রমুখ), ২. বাবার মা, যত ওপরের দিকে হোক (যেমন_ দাদি, দাদির মা প্রমুখ), ৩. পূর্ণ বোন (বাবা-মা একই), ৪. বৈপিত্রেয় বোন, ৫. পূর্ণ বোনের কন্যা, যত নিচের দিকে হোক, ৬. বৈপিত্রেয় বোনের কন্যা, যত নিচের দিকে হোক, ৭. পূর্ণ খালা, যত ওপরের দিকে হোক, ৮. বৈপিত্রেয় খালা, যত ওপরের দিকে হোক, ৯. পূর্ণ ফুফু (বাবার আপন বোন)। উপরোলি্লখিত মহিলারা না থাকলে নাবালকের যারা অভিভাবক হতে পারেন, তারা জিম্মাদারিত্বের অধিকার পাবেন। অর্থাৎ ১. বাবা, ২. নিকটতম দাদা, ৩. পূর্ণ ভাই (যাদের বাবা-মা এক), ৪. পূর্ণ ভাইয়ের ছেলে, ৫. রক্ত সম্পর্কীয় ভাইয়ের ছেলে, ৬. উত্তরাধিকারে বাবার বংশের সমান শ্রেণীভুক্ত অন্যান্য আত্মীয়, যেমন_ চাচা।
সন্তানের অভিভাবক কে হবেন :
মুসলিম আইন অনুযায়ী মা যদিও স্বাভাবিক অভিভাবক নন, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অভিভাবকত্বের আবেদন করতে পারেন, যেমন_ মা যদি দেখেন সন্তানের প্রকৃত অভিভাবক যিনি, তিনি ঠিকমতো দেখাশোনা করছেন না বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন তবে মা নিজ সন্তানের প্রকৃত কল্যাণের জন্য তার কাছে সন্তান থাকা উচিত মর্মে অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন করতে পারেন। ছেলে সন্তানের ৭ বছর পূর্ণ হলে এবং কন্যা সন্তানের বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছলে নিম্নোক্ত ব্যক্তিরা অভিভাবকত্বের অধিকার পেতে পারেন। ১. বাবা, ২. বাবা কর্তৃক সম্পাদিত উইলে সন্তানের অভিভাবকত্ব যে ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে, ৩. বাবার বাবা_ যত ওপরেই হোক, ৪. আপন ভাই, ৫. রক্ত সম্পর্কের ভাই, ৬. আপন ভাইয়ের ছেলে, ৭. রক্ত সম্পর্কীয় ভাইয়ের ছেলে, ৮. বাবার আপন ভাইয়ের ছেলে, ৯. বাবার রক্ত সম্পর্কীয় ভাইয়ের ছেলে। যে ক্ষেত্রে এ রকম কোনো আত্মীয়ও নেই, সে ক্ষেত্রে আদালত তার স্ববিবেচনামূলক ক্ষমতাবলে যে কাউকে নাবালক, নির্বোধ, উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির অভিভাবক নিয়োগ করতে পারে।
আদালত কেন অভিভাবক নিয়োগ করবেন:
যদি কোনো নাবালকের স্বাভাবিক অভিভাবক থেকে থাকে, তবে আদালতের মাধ্যমে অভিভাবক নিয়োগের কোনো প্রয়োজন নেই। তবে স্বাভাবিক অভিভাবক তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বা স্বাভাবিক অভিভাবকের মৃত্যু হলে অভিভাবকত্বের অধিকার নিয়ে মা-বাবা বা দাদা বা নানি-বাবার মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে ও সন্তানের অভিভাবকত্ব দাবি করে একাধিক আবেদনপত্র জমা হলে আদালত সমগ্র পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ শেষে নাবালকের কল্যাণের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত ব্যক্তিকে অভিভাবক নিয়োগ করবে। সন্তানের সম্পত্তির অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইন ৩ ধরনের অভিভাবকত্ব স্বীকার করে।
১। নাবালকের সম্পত্তি হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে আইনগত অভিভাবকের ক্ষমতা কতটুকু :
একজন আইনগত অভিভাবক নাবালকের খাদ্য, বস্ত্র বা লালন-পালনের মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে নাবালকের জিনিসপত্র ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা বন্ধক দিতে পারেন। এ ছাড়া একজন আইনগত অভিভাবক শুধু নিম্নলিখিত এক বা একাধিক কারণে নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় করতে পারেন যখন_ ১. ক্রেতা দ্বিগুণ মূল্য দিতে প্রস্তুত, ২. সম্পত্তিটি ধ্বংসের পথে, ৩. যদি সম্পত্তির ব্যয় তার আয়কে ছাড়িয়ে যায়। তবে এ জাতীয় বিক্রয় কেবল নাবালকের ভরণপোষণ বা উইলের দাবি পরিশোধ, ঋণ বা ভূমি কর পরিশোধের জন্যই করা যেতে পারে, ৪. সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে।
২. আদালত কর্তৃক নিয়োগকৃত অভিভাবক:
উপরোক্ত আইনগত অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে সন্তানের সম্পত্তির অভিভাবকদের জন্য আদালত কর্তৃক কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে নাবালকের সম্পত্তির তত্ত্বাবধানের জন্য নিযুক্ত অভিভাবক আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি কোনো অংশ বন্ধক দিতে বা বিক্রয়, দান, বিনিময় বা অন্য কোনো প্রকারে হস্তান্তর করতে পারেন না।
৩. কার্যত অভিভাবক :
কোনো ব্যক্তি আইনগত অভিভাবক কিংবা আদালত কর্তৃক নিয়োগকৃত অভিভাবক না হলেও স্বেচ্ছায় নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির দায়িত্ব নিতে পারেন। এ ধরনের অভিভাবকত্বকে কার্যত অভিভাবক বলা হয়। একজন কার্যত অভিভাবক নাবালকের ব্যক্তির (শরীর) ও সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক মাত্র। একজন কার্যত অভিভাবক নাবালকের স্থাবর সম্পত্তির কোনো স্বত্ব, স্বার্থ বা অধিকার হস্তান্তর করতে পারেন না এবং তিনি তা করলে সে হস্তান্তর বাতিল হবে। মা, চাচা, ভাই, শ্বশুর প্রমুখ হলেন কার্যত অভিভাবক। নাবালকের কোনো স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় বা যে কোনো ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা তার নেই। সন্তানের ক্ষেত্রে বাবার বংশের লোকদের ওপর প্রথমে দায়িত্ব ন্যস্ত হবে। তারা ব্যর্থ হলে মায়ের বংশের আত্মীয়রা নাবালকের বিবাহ চুক্তি সম্পাদনের দায়িত্ব পাবেন। তবে উপমহাদেশে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯’ পাস হওয়ার পর থেকে সন্তানের ক্ষেত্রে অভিভাবকত্ব কার্যকরী নয়। কারণ এ আইনে প্রাপ্তবয়স্ক (ছেলের ক্ষেত্রে ২১ ও মেয়ের ক্ষেত্রে ১৮ বছর) না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ যতদিন পুত্র-কন্যার ব্যাপারে নিজস্ব মতামত দানে সক্ষম না হয়, ততদিন অভিভাবকদের দেওয়ারও কোনো এখতিয়ার নেই। উপরন্তু ওই আইনের ৫ ধারা অনুসারে বাল্যবিবাহ সম্পাদনকারী অভিভাবক ও সহায়তাকারী সবাই ১ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রমে কারাদ- বা ১ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। মুসলিম আইনে সন্তানকে দেওয়ার জন্য উইল করে কোনো অভিভাবক নিয়োগের প্রচলন নেই। মুসলিম আইনে সন্তানের অভিভাবক নিযুক্তির জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতার দরকার নেই। মনোনীত ব্যক্তি ১৮ বছর বয়স্ক ও সুস্থ-মস্তিষ্ক হলেই অভিভাবক হওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হন। গার্ডিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০-এর ধারা ১৭ (ক)-এর অধীনে নাবালকের অভিভাবক হিসেবে নিযুক্তির জন্য শুধু নিকটাত্মীয় বা প্রিয়জনই নয়, নাবালকের যে কোনো আত্মীয় বা বন্ধুও পারিবারিক আদালতের কাছে আবেদন করতে পারেন। আদালত এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অভিভাবকত্ব নির্ধারণ করতে পারে_ ক. নাবালকের কল্যাণ, খ. নাবালকের বয়স, লিঙ্গ ও ধর্ম, গ. আবেদনকারী অভিভাবকের চরিত্র ও আর্থিক সক্ষমতা, নাবালকের সঙ্গে তার গোত্র-সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা, ঘ. বাবা-মা কারো মৃত্যু হয়ে থাকলে মৃতের অন্তিম ইচ্ছা (কার কাছে সন্তান মানুষ হবে সে বিষয়ে), ঙ. নাবালক বা তার সম্পত্তির সঙ্গে আবেদনকারী অভিভাবকের অতীত বা বর্তমান কোনো সম্পর্ক থেকে থাকলে, চ. নাবালকের নিজস্ব ইচ্ছা, তার অভিভাবক নির্বাচনের মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা থেকে থাকলে।
ভরণপোষণ :
জীবনে বেঁচে থাকতে হলে যা যা প্রয়োজন, যেমন_ খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানসহ যাবতীয় চাহিদা পূরণই হল ভরণপোষণ। মুসলিম আইন অনুসারে, সন্তান-সন্ততি ও উত্তরসূরি, বাবা-মা ও পূর্বসূরি ও অন্য দরিদ্র আত্মীয়দের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক যেসব অধিকার ও দায়িত্বের সৃষ্টি হয় সেগুলোর মধ্যে ভরণপোষণ অন্যতম। মুসলিম আইনে স্ত্রীর ভারণপোষণ দেওয়া স্বামীর অবশ্য কর্তব্য। সে স্ত্রী মুসলিম বা কিতাবীয়, ধনী বা গরিব, তরুণী বা বৃদ্ধা_ যা-ই হোক না কেন বিবাহিত জীবনের সব সময়েই স্ত্রী, স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবেন। এ ছাড়া স্বামী যদি স্ত্রীর মোহরানার তাৎক্ষণিক অংশ পরিশোধ না করেন বা স্বামী যদি স্ত্রীর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেন, তবে সে ক্ষেত্রেও স্ত্রী, স্বামীর কাছ থেকে পৃথকভাবে বসবাস করতে পারেন ও ভরণপোষণ চাইতে পারেন। কিংবা স্বামী যদি স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় করেন বা কোনো রক্ষিতা রাখেন, সে ক্ষেত্রে স্ত্রী, স্বামীর সঙ্গে একত্রে বসবাসে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন ও ভরণপোষণ চাইতে পারেন।
উল্লেখ্য, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী আর ভরণপোষণ পাবেন না। কারণ তখন তিনি উত্তরাধিকারী হবেন। তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী ইদ্দত চলাকালীন পর্যন্ত ভরণপোষণ পাবেন। কোনো স্ত্রী ভরণপোষণ পেতে অধিকারী কি না সে বিষয়টি সুস্থির করার জন্য স্ত্রীর সামর্থ্য বিবেচনায় আসবে না। স্বামী তাকে যথোপযুক্তভাবে ভরণপোষণ দেননি, কেবল এ বিষয়টিই স্ত্রীকে ভরণপোষণের একটি আদেশ পাওয়ার অধিকারী করবে। মুসলিম আইনে একজন বাবা তার নাবালক পুত্র-কন্যার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। শুধু যখন পুত্র সন্তান বয়ঃসন্ধিতে পদার্পণ করে সে সময় থেকে পিতা-পুত্রের ভরণপোষণ দিতে আর বাধ্য নন। কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে এ সময়সীমা যতদিন বা তার হচ্ছে, সে সময় পর্যন্ত বহাল থাকে। অর্থাৎ মেয়ের না হওয়া পর্যন্ত বাবা তাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকেও বাবা ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। তবে বিধবা পুত্রবধূর ভরণপোষণে তিনি বাধ্য নন। যদি কোনো বাবার যুবক সন্তান পঙ্গু বা অসমর্থ হয়ে থাকে, তবে বাবা তাকে ভরণপোষণ প্রদান করবেন। নাবালক পুত্র ও অবিবাহিত কন্যা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বাবার কাছ থেকে পৃথক বসবাস শুরু করলে, বাবা সে ক্ষেত্রে তাদের ভরণপোষণে বাধ্য নন। যে শিশু সন্তানের নিজস্ব সম্পত্তি রয়েছে, বাবা তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন। দরিদ্র বা অভাবী বাবা, মা, দাদা ও দাদিকে ভরণপোষণ জোগানো যে কোনো সামর্থ্যবান ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য। দরিদ্র বাবা-মাকে ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তানদের ওপর সমভাবে বর্তায়, তা সে সন্তান ধনী বা গরিব, ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক না কেন অন্য দরিদ্র আত্মীয়দের উত্তরাধিকারে তাদের প্রাপ্য অংশের অনুপাত হিসেবে ভরণপোষণ দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনগুলোর আওতায় একজন মুসলিম স্ত্রী নিম্নোক্ত পন্থায় স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ আদায় করতে পারেন। ক. ধারা নং ৪৮৮, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর অধীনে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে মাসিক ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। এ আইনের বিধানমতে স্ত্রীর ভরণপোষণ আদায়ের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করা যায়। খ. ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের ৪ (গ) ধারার অধীনে একজন মুসলিম স্ত্রী, তার ভরণপোষণ আদায়ের জন্য সরাসরি পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। পারিবারিক আদালতকে এ ব্যাপারে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৮ ধারার এখতিয়ার পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ দ্বারা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে বাতিল বলা যায়। ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর অবস্থা ও পদমর্যাদা বিবেচনা করে আদালত একটি যথোপযুক্ত পরিমাণ ধার্য করবে।
আদালতের ধার্যকৃত তারিখে যদি স্বামী ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন, তবে আদালত তাকে ১ মাসের কারাদন্ডের আদেশ দিতে পারে। কারাদন্ড ভোগ করলেও ভরণপোষণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে একাধিক কিস্তির আদেশ বরখেলাপের কারণে আদালত একাধিকবার কারাদ- দিতে পারে। গ. ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের ২ (খ) ধারার অধীনে, কোনো স্বামী ২ বছর পর্যন্ত স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য মামলা করতে পারেন এবং এভাবে স্বামী ভরণপোষণ প্রদানে বাধ্য করতে পারেন। ঘ. ইদানীং দেশে অসহায়, নির্যাতিত ও দরিদ্র মেয়েদের পক্ষে মামলা দাখিল ও পরিচালনা করাসহ নানা ধরনের আইনগত সাহায্য দিতে বহু সংগঠন এগিয়ে আসছে। এসব সংগঠন বা সংস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সংস্থা, মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট প্রভৃতি। অসহায়, নির্যাতিত মেয়েরা, যারা স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাচ্ছে না সাহস বা আর্থিক সঙ্গতি যাদের নেই তারা এসব সংস্থায় যোগাযোগ করলে বিনা খরচে মামলায় লড়তে পারবেন ও ভরণপোষণ আদায়ে সক্ষম হবেন।
Source: ainoainjibi.com