জেনে নিন মুসলিম আইনে উত্তরাধিকার আইন ও সম্পদ বন্টন

সম্পত্তি অর্জনের প্রতি মানুষের ঝোঁক চিরন্তন। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা সম্পত্তির ভাগ বণ্টনে স্বার্থ- দ্বন্দ্ব কমিয়ে এনে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের ভূমিকা অনন্য। সমগ্র আইন ব্যবস্থার মধ্যে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন সবচেয়ে সুন্দর ও বিস্তারিতভাবে উত্তরাধিকার নীতিমালা প্রনয়ন ও প্রয়োগ করেছে। জে. এন. ডি এন্ডারসনের ভাষায়, “ইসলামিক আইন ব্যবস্থার মধ্যে উত্তরাধিকার আইনই যৌক্তিক ও কার্যকরভাবে (ইসলামের) সৌন্দর্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে”।

ইসলামী উত্তরাধিকার আইন সামাজিক, আইনগত ও ধর্মীয় বিষয়গুলোকে একীভূত করে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ সম্পত্তি বন্টনের ব্যবস্থা করেছে।

প্রয়োগ:

দ্য মুসলিম পার্সোনাল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭” (The Muslim Personal Sariah Application Act, 1937) এর ২ ধারা অনুসারে ইসলামী উত্তরা্ধিকার আইন সকল মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এছাড়াও “মুসলিম ফ্যামিলি ল’স অর্ডিন্যান্স ১৯৬১” (Muslim Family Law’s Ordinance, 1961) এর ৪ ধারা (যদিও ততটা শরীয়তসম্মত নয়) মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

সম্পত্তিবন্টনেরসাধারণনীতিমালা:

মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পরে তার সম্পত্তি নিম্মোক্ত পদ্ধতিতে বন্টন করতে হবে। প্রথমে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি হতে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। অতঃপর তার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। অধিকাংশ বিদ্বানের মতে, আল্লাহর ঋণ তথা যাকাতও এ খাত থেকে আদায় করতে হবে। ঋণ আদায়ের পর মৃত ব্যক্তির বৈধ ওসিয়ত/উইল অনুযায়ী তা আদায় করতে হবে। এই তিন খাতে ব্যয় করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি তার জীবিত উত্তরাধিকারদের মধ্যে কুরআন, সুন্নাহ অনুযায়ী বন্টন হবে।

যদিও জাফরী বেগম বনাম আমির মুহম্মদ খান (১৮৮৬) অল ইন্ডিয়া রিপোর্ট ৮২২, মামলায় বলা হয়েছে “যে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথেই তার উত্তরাধিকারীদের উপর সম্পত্তি ন্যাস্ত হয়, তা সত্ত্বেও অধিকাংশ পণ্ডিতদের মতে ঋণ ও উইল আদায়ের পরই তা উত্তরাধিকারীরা পাবে।

সম্পত্তি বন্টনের জন্য তিনটি পূর্ব শর্ত আছে। তা হল:

ক. সম্পত্তির মালিককে মৃত হতে হবে। জীবিত ব্যক্তির সম্পত্তিতে কোন উত্তরাধিকার নেই।

খ. মৃত ব্যক্তির কাছের বা দূরের জীবিত নিকটাত্মীয়/উত্তরাধিকারী থাকতে হবে।

গ. মৃত ব্যক্তিকে সম্পত্তি রেখে যেতে হবে।

উত্তরাধিকারীদেরপ্রতিবন্ধকতা:

ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে কিছু কারণে উত্তরাধিকারী বঞ্চিত হয়। নিম্নে কারণ গুলো দেওয়া হল:

ক. কোন হত্যাকারী হত্যাকৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হতে পারবে না।

খ. অবৈধ সন্তান তার অনুমিত পিতার সম্পত্তি পাবে না।

গ. অমুসলিম আত্মীয় কোন মুসলিমের সম্পত্তিতে ওয়ারিশ হবে না।

ঘ. আত্মীয় স্বজন ভিনদেশের নাগরিক হলে সম্পত্তি পাবে না। তবে এই শর্ত অনেকটাই শিথিলের পথে এবং অনেক মুসলিম দেশ এই নিয়ম এখন মানে না।

উত্তরাধিকারীদেরশ্রেনীবিন্যাস:

মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশগণকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যথা:

১. শেয়ারার বা নির্দিষ্টাংশ ভোগী। যে সমস্ত ব্যক্তিদের অংশ কুরআনে সুস্পষ্টভাবে আছে তাদেরকে শেয়ারার বলে। সম্পত্তি সর্বপ্রথম এদের মধ্যে বন্টন করতে হবে। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ১২ ধরনের ওয়ারিশ শেয়ারার আছে-

ক. স্বামী

খ. স্ত্রী

গ. পিতা

ঘ. মাতা

ঙ. কন্যা

চ. ছেলের মেয়ে

ছ. দাদা

জ. নানী, দাদী

ঝ. আপন বোন

ঞ. সৎ বোন

ট. বৈপিত্রীয় বোন

ঠ. বৈপিত্রীয় ভাই

এটা সর্বজনবিদিত যে, সমস্ত ওয়ারিশ একই সাথে সম্পত্তি পায় না। তাই নির্দিষ্টাংশভোগীদের মধ্যে প্রাধান্য দেওয়ার কিছু নীতি আছে। যেমন-স্বামী, স্ত্রী, পিতা, মাতা ও কন্যা কখনোই বঞ্চিত না হয়। অপরদিকে দাদী, নানী, ছেলের মেয়ে, আপন বোন, সৎ বোন, বৈপিত্রীয় ভাই-বোন সম্পত্তি সব সময় নাও পেতে পারেন।

২. অ্যাগনেটিক হিয়ার বা আসাবা/অবশিষ্টভোগী: এরা মৃতদের ঐ সমস্ত ওয়ারিশ, যাদের সাথে মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের মাধ্যম হল পুরুষ, কোন মহিলা নয়। যেমন ভাই বাবার মাধ্যমে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ অবশিষ্টাংশভোগী পুরুষদের সম্পত্তি প্রদানের পর যদি সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে, তাহলে আসাবারা সম্পত্তি পাবে। অন্যথায় নয়। ছেলে ও মেয়ে একসাথে থাকলে তারা উভয়েই অবশিষ্টভোগী হয়। তাদের মাঝে বন্টনের অনুপাত ছেলে : মেয়ে= ২:১ অনুপাতে হয়।

দূরবর্তী আত্মীয়: মৃত ব্যক্তির যদি শেয়ারার বা অ্যাগনেটিক হিয়ার না থাকে তাহলে দূরবর্তী আত্মীয়রা তার সম্পত্তি পাবে।

সর্বোপরি আমরা বলতে পারি যে, আসাবারা শেয়ারারদের উপস্থিতিতে সম্পত্তি পেতে পারে। তবে আসাবাদের উপস্থিতিতে কোন ডিসট্যান্ট কাইন্ডারড (Distant Kindered) কখনোই সম্পত্তি পাবে না।

প্রাধান্যনীতি:

ওয়ারিশদের মধ্যে প্রাধান্য বা কোন ওয়ারিশকে কীভাবে বাদ দিতে হবে সে সম্পর্কে সরাসরি কোন কিছু কুরআন বা হাদিসে উল্লেখ নেই। তবে ইসলামী গবেষকগণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে কিছু নিয়মনীতি বের করেছেন। যেমন:

ক. নিকটবর্তী ওয়ারিশ দূরবর্তীকে বঞ্চিত করে। উদাহরণ স্বরূপ, ছেলে ভাইকে বঞ্চিত করে।

খ. মৃত ও ওয়ারিশের মাঝে সংযোগকারী ব্যক্তি উপস্থিত থাকলে উক্ত ওয়ারিশ কোন সম্পত্তি যেমন মৃতের পিতা থাকলে বোন ভাই কোন সম্পদ পাবে না। অবিমিশ্র সম্পর্ক (আপন ভাই বোন) অর্ধমিশ্রিত (সৎ ও বৈপিত্রিয় ভাইবোন কে) সম্পর্ককে বঞ্চিত করে।

সংক্ষেপে তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আলোচনা করা হল। এখন কিছু উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পাঠকের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস পাব।

ওয়ারিশ অংশ কমন হর = ২৪ নতুন কমন হর = ৭২  
স্ত্রী ১/৮ ৩/২৪ ৯/৭২  
পিতা ১/৬ ৪/২৪ ১২/৭২  
মাতা ১/৬ ৪/২৪ ১২/৭২  
ছেলে অবশিষ্ট

 

১৩/২৪ (১৩/২৪ এর ২/৩= ২৬/৭২ (পুত্র)

১৩/২৪ এর ১/৩=১৩/৭২(কন্যা)

২৬/৭২
কন্যা ১৩/৭২  

অত্র উদাহারনে স্ত্রী, পিতা, মাতা হল নির্দিষ্ট অংশভোগী। তাদেরকে প্রথমে দেওয়ার পরে আসাবা হিসাবে ছেলে এবং মেয়েকে দিতে হবে। স্ত্রীর অংশ হল আট ভাগের এক ভাগ, পিতার হল ছয় ভাগের এক ভাগ এবং মাতার ভাগ হল ছয় ভাগের এক ভাগ। যেহেতু ৬ এবং ৮ এর ল,সা,গু ২৪, তাদেরকে দেওয়ার পর ছেলে এবং মেয়ে পাবে ১৩/২৪। পরবর্তীতে ছেলে এবং মেয়ের মাঝে বণ্টনের জন্যে ৭২ কে লসাগু নিয়ে অঙ্কটি সমাধান করা হয়েছে।

এভাবে মুসলিম ফারায়েজে ওয়ারিশ সম্পত্তি বন্টিত হয়।