Don't Miss
Home / BD LAWS / নামখারিজ, নামজারী বা মিউটেশন (Mutation) এর আদ্যপান্ত

নামখারিজ, নামজারী বা মিউটেশন (Mutation) এর আদ্যপান্ত

কোন ব্যক্তি কোন জমির মালিকানা লাভ করার পর তার নাম সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে অন্তর্ভূক্ত করা বা তার নিজ নামে নতুন খতিয়ান খোলার যে কার্যক্রম তাকে নামজারী বা মিউটেশন (Mutation) বলে । দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে জরিপের মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় বলে দুই জরিপের মধ্যবর্তী সময়ে উত্তরাধিকার কিংবা দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের ফলে ভূমি মালিকানার পরিবর্তন বা খতিয়ান হালনাগাদ করার জন্য রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্র্জাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ১৪৩ ধারায় কালেক্টরকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। কালেক্টরের এ ক্ষমতা মাঠ পর্যায়ে বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) গণ প্রয়োগ করে থাকেন ।

সুতরাং অন্তবর্তীকালীন রেকর্ড পরিবর্তন, সংশোধন ও হালকরণের প্রক্রিয়াকে নামজারী (mutation) বা জমাখারিজ নামে আখ্যায়িত করা হয়।

মিউটেশন এর উপকারিতাঃ

১।  যে কোনো সময় জমি বিক্রয় করা যায়।
২। ভূমির মালিকানা হালনাগাদ হয় ।
৩। ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা সহজ হয় ।
৪। খতিয়ান হালনাগাদ থাকার ফলে জরিপ কাজে সুবিধা হয়।
৫। সরকারের খাস জমি সংরক্ষণে সুবিধা হয় ।

নামজারীর প্রয়োজনীয়তাঃ
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১১৬, ১১৭ ও ১৪৩ ধারা অনুযায়ী নামজারী প্রক্রিয়া অর্থাৎ মিউটেশন সম্পূর্ণ করা হয়। নামজারীর প্রয়োজনীয়তা নিম্নরূপ:
১। মূল ভূমি মালিকের মৃত্যুতে উত্তরাধিকারগণের নামে খতিয়ান সৃষ্টি।

২। রেজিষ্ট্রি দলিলমূলে জমি হস্তান্তরের কারণে ক্রেতা বা গ্রহিতার নামে খতিয়ান সৃষ্টি।
৩। ভূমি উন্নয়ন করের বকেয়া বাবদ নিলাম খরিদার জন্য।

৪। স্বত্ব মামলার রায়/ডিক্রির কারণে।
৫। জমি অধিগ্রহণের কারণে।

৬। খাস খতিয়ানভূক্ত করণের ফলে।
৭। সরকার কর্তৃক ক্রয়কৃত বা অন্য কোন খাস জমি বন্দোবস্তের কারণে।
৮। পরিত্যাক্ত বা নদী সিকস্তির কারণে ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফের কারণে।
৯। নদী পয়স্তিজনিত কারনে রেকর্ড সংশোধনের জন্য নামজারী।

বিলম্বে নামজারী করার ফলাফল:

১. ভূমি উন্নয়ন কর আদায় ও প্রদানে জটিলতার সৃষ্টি হয়।
২. বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা দায়ের হয়।
৩. জমি ক্রয় বিক্রয়ের জটিলতার সৃষ্টি হয়।

সর্বোপরি মালিকানা বা দখল প্রমাণের ক্ষেত্রে নামজারি সংক্রান্ত কাগজাপত্রাদি গুরুত্বপূর্ন কাগজ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

মিউটেশন এর ধরণঃ

১। শুধু নামজারী বা নামপত্তনঃ
কোন একজন রেকডীয় মালিকের নামের পরিবর্তে ঐ একই খতিয়ানে পরবর্তী গ্রহীতা ও ওয়ারিশগণের নামভূক্ত হলে তা রাস্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারা মতে শুধু নামপত্তন বা নামজারী হিসেবে বিবেচিত হবে।
২। নাম পত্তন ও জমা খারিজঃ
কোন দাগের জমি বিক্রয় বা অন্য কোন প্রকার হস্তান্তরের মাধ্যমে বিভক্ত হলে এবং ঐ বিভক্তির জন্য পৃথক হিসাব বা হোল্ডিং খুলে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের আদেশ হলে তা নামপত্তন ও জমা খারিজ হিসেবে বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে জমির মালিকানার পরিবর্তন হবে এবং পৃথক খতিয়ান এবং হোল্ডিং নম্বর পড়বে। রাস্ট্রীয় অধিগ্রণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ও ১১৭ ধারা মতে এ প্রক্রিয়ায় নামপত্তন হয়ে থাকে।
৩। নাম পত্তন ও জমাখারিজ একত্রিকরণঃ
কোন ব্যক্তির একই মৌজার ভিন্ন ভিন্ন খতিয়ানে জমি থাকলে উক্ত খতিয়ানগুলোতার অধিকৃত জমি একই খতিয়ানে ভুক্ত করে নামপত্তন করলে অর্থাৎ রেকর্ড সংশোধন করলে তাকে নামপত্তন ও জমা একত্রীকরণ করা বলা হয়। রাস্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ও ১১৬ ধারা মতে এ প্রক্রিয়ায় কাজ সম্পদিত হয়।

নামজারীর আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
১। ২০ (বিশ) টাকার কোর্টফি সহ মূল আবেদন ফরম।
২। আবেদনকারীর ১ (এক) কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি (একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য ছবি প্রযোজ্য)।
৩। খতিয়ানের ফটোকপি/সার্টিফাইড কপি।
৪। ধার্যকৃত বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ (দাখিলা)।
৫। সর্বশেষ জরিপের পর থেকে বায়া/পিট দলিলের সার্টিফাইড/ফটোকপি।
৬। উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা লাভ করলে অনধিক তিন মাসের মধ্যে ইস্যুকৃত মূল উত্তরাধিকার সনদ।
৭। আদালতের রায়ের ডিক্রির মাধ্যমে জমির মালিকানা লাভ করলে উক্ত রায়ের সার্টিফাইড/ফটোকপি। আপীল হয়ে থাকলে তার তথ্য বা ডিক্রির সার্টিফাইড কপি বা ফটোকপি।
৮। আবেদনকারীর পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি ( জাতীয় পরিচয়পত্র / ভোটার আইডি / জন্ম নিবন্ধন সনদ/ পাসপোর্ট / ড্রাইভিং লাইসেন্স/ অন্যান্য)

নামজারী করার ধাপ সমুহ
১। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ড/পর্চা ও মালিকানা অর্জনের বিবরণ সম্বলিত আবেদন দাখিল।
২। সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক সরেজমিন তদন্তের জন্য আবেদনটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রেরণ।
৩। ইউনিয়ন ভূমি অফিস কর্তৃক প্রস্তাব/প্রতিবেদন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে প্রেরণ।
৪। সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক সংশ্লিষ্ট পক্ষগণকে শুনানীর জন্য নোটিশ প্রদান।
৫। নোটিশ প্রাপ্তির পর যাবতীয় মুল কাগজ পত্রের প্রমানাদিসহ আবেদনকারীর শুনানীতে অংশ গ্রহন এবং অত:পর আদেশ প্রদান।

নামজারীর প্রয়োজনীয় ফি:

আবেদনের সাথে কোর্ট ফি ২০/- (দশ) টাকা
নোটিশ জারী ফি ৫০/- (পঞ্চাশ) টাকা
রেকর্ড সংশোধন বা হালকরণ ফি ১০০০/-(এক হাজার) টাকা।
প্রতি কপি মিউটেশন খতিয়ান সরবরাহ বাবদ ১০০/-(একশত) টাকা

বিঃদ্রঃ আবেদন পত্রের কোর্টফি ছাড়া বাকিগুলো ডিসিআর এর মাধ্যমে আদায় করা হবে।

নামজারীর ক্ষেত্রে সময়সীমা:
মহানগরের ক্ষেত্রে ৪৫ ( পঁয়তাল্লিশ) কার্যদিবস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবস।

জেনে রাখা দরকারঃ
১। শুনানী গ্রহণকালে দাখিলকৃত কাগজের মূল কপি অবশ্যই আনতে হবে।
২। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দখল/প্রয়োজনীয় মালিকানার রেকর্ডপত্র দেখাতে হবে।
৩। নামজারী খতিয়ান এবং ডিসিআর প্রাপ্তির সাথে সাথে আপনার নামে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে হিসাব খোলা নিশ্চিত করুন এবং ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান করে দাখিলা নিন।
৪। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও যে কোন অভিযোগের ক্ষেত্রে সরাসরি সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর সাথে যোগাযোগ করুন।
৫। www.minland.gov.bd এ ওয়েবসাইট থেকে বিনামূল্যে ফরম ডাউনলোড করে ব্যবহার করা যায়।

নামজারী বিষয়ক অধিকার:
১। নামজারীর মাধ্যমে নতুন মালিকানা তথা হোল্ডিং সৃষ্টি করার অধিকার (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৩ ধারা)
২। নির্ধারিত কোর্ট ফি দিয়ে এসি ল্যান্ডের নিকট নামজারীর জন্য আবেদন করার অধিকার (ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০)
৩। সংশোধিত খতিয়ান সংগ্রহের অধিকার (ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০)
৪। ষড়যন্ত্র করে বা ভুলক্রমে অন্যের নামে নামজারী হয়ে থাকলে তা সংশোধনের অধিকার (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৩ ধারা)
৫। রাজস্ব অফিসারের আদেশে অসন্তুষ্ট হলে তার বিরুদ্ধে জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) এর নিকট মামলা করার অধিকার (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৭ ধারা)
৬। আপীলের জন্য সময় পাবার অধিকার (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৮ ধারা)
৭। রিভিশনের অধিকার (যদি আপীল করা না হয়ে থাকে) (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৭ ধারা)
৮। রিভিউ পুন:বিবেচনার অধিকার (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৯ ধারা)
৯। জমির ক্রেতা যদি সমবায় সমিতি বা হাউজিং কোম্পানি হয় তাহলে নামজারীর অধিকার (ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০ এর অনুচ্ছেদ ৩২৭, ৩২৮)

আইনি প্রতিকারঃ

আপীল: নামজারীর বিষয়ে কোন ব্যাক্তি অসন্তুষ্ট হলে জেলা প্রশাসকের নিকট আপীল করা যাবে (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৮ ধারা)

সহকারী কমিশনার(ভূমি) কর্তৃক আদেশ প্রদানের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের নিকট, জেলা প্রশাসক কর্তৃক আদেশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনারের নিকট ৬০ দিনের মধ্যে আপীল করতে হবে, বিভাগীয় কমিশনার কর্তৃক প্রদত্ত আদেশের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে ভূমি আপীল বোর্ডে আপীল করতে হবে।

রিভিশন: (যদি আপীল করা না হয়) অসন্তুষ্ট ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে বা জেলা প্রশাসক নিজে উক্ত আদেশটি পুন:নীরিক্ষণ করতে পারবেন (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৪৯ ধারা)।প্রদত্ত আদেশের তারিখ হতে ০১ মাসের মধ্যে, প্রদত্ত আদেশের তারিখ হতে ০৩ মাসের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনারের নিকট রিভিশনের জন্য আবেদন করতে হবে, প্রদত্ত আদেশের তারিখ হতে ০৬ মাসের মধ্যে ভূমি আপীল বোর্ডে নিজের উদ্যেগে বা আবেদনের ভিত্তিতে।

রিভিউ: (যদি আপীল বা রিভিশন না করা হয়) (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যন্সি এক্টের ১৫০ ধারা)। পূর্ববর্তী আদেশ প্রদানের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ এর জন্য আবেদন করতে হবে।

Source: http://landregistrationbd.com

Print Friendly, PDF & Email

About admin

WpCoderX